14 Sept 2020
বিশ্বাসের চশমাটাকে খুলে রেখে দেখো
প্রচলিত ধর্ম--- দর্শন---মতবাদ -এর কথা আমি বলতে পারবো না। আমাদের ধর্ম-দর্শন-মতবাদে এই মহাবিশ্ব অস্তিত্বই হলো ঈশ্বর। এই বিশ্ব-অস্তিত্বকে কি তুমি অস্বীকার করতে পারো !?
বিশ্বাসের চশমাটাকে খুলে রেখে দেখো। 'মহাধর্ম' ও 'মহাবাদ'-এর মধ্যে তুমি তোমার বিশ্বাসের ঈশ্বরকে খুঁজতে যেওনা। —পাবেনা। তথাকথিত স্বর্গলাভ– ঈশ্বরলাভ অথবা ব্রহ্মলাভের কোন পথ বা পদ্ধতির সন্ধান নেই এখানে। আছে মানবত্ব লাভের উপায়।
বিশ্বাসের চশমাটাকে খুলে রেখে, যথাসম্ভব প্রভাবমুক্ত হয়ে— খোলা মন নিয়ে, সত্যানুসন্ধিৎসুর দৃষ্টি নিয়ে-– এর গভীরে প্রবেশ করলে, তবেই বিস্ময়কর সত্য তোমার কাছে প্রকাশলাভ করবে।
'মহাধর্ম' ও 'মহাবাদ' হলো— যথাক্রমে এক স্বতন্ত্র ধর্ম এবং স্বতন্ত্র মতবাদ। বিভিন্ন শাস্ত্র —বিভিন্ন মতবাদ অথবা প্রচলিত ধ্যান-ধারণার সাথে এর তুলনামূলক বিচার করতে গেলে, ধন্দে পড়ে যাবে। দেখবে, কোথাও হয়তো মিলছে, কোথাও মিলছে না। তারফলে, তোমরা অনেকেই মানসিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে— হতবুদ্ধি হয়ে যেতে পারো।
তাই, 'মহাধর্ম' ও 'মহাবাদ'-এর দ্বারা লাভবান হতে চাইলে, একে এর দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। যুক্তিবাদী সচেতন মুক্ত মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
ঠিকমতো উপলব্ধি হলে, তখন বুঝতে পারবে, কোনটা লভ্য ---কোনটা লাভ করা সম্ভব, আর কোনটা আকাশ-কুসুম কল্পনা! বুঝতে পারবে, এতদিন কিভাবে মরিচিকার পিছনে ছুটে ছুটে মরেছো তুমি। বুঝতে পারবে মানব জীবনের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য কী।
তুমি নিজেই উপলব্ধি করতে পারবে, তোমার জীবনের অধিকাংশ অসাফল্য— পরাজয়, হানি, অধিকাংশ দুঃখ– কষ্ট —যন্ত্রনার পিছনে প্রধানত দায়ী—তোমার অজ্ঞানতা, তোমার অন্ধ-বিশ্বাস। সঠিকভাবে নিজেকে না জানার ফলে, তোমার সামনের মানুষকে ঠিকমতো চিনতে না পারার ফলে, তুমি বহুবার ঠকেছ— প্রতারিত হয়েছো। এর পুণরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে, যতদিন না তুমি আলস্যতা কাটিয়ে সজাগ–সচেতন থেকে— সত্য– মিথ্যা, বাস্তব– অবাস্তব-কে চেনার ক্ষমতা লাভ করছো।
নিজেকে সজাগ–সচেতন রেখে— প্রভাবমুক্ত হয়ে, যুক্তি-বিচার প্রয়োগ করে, সত্যানুসন্ধান করতে, গভীরভাবে চিন্তা করতে, অনেকটাই মানসিক পরশ্রম করতে হয়। তার চাইতে বিশ্বাস করা অনেক সহজ কাজ। বিশ্বাস করতে তেমন পরিশ্রমের দরকার হয় না। তাই, মানসিক শ্রমবিমুখ মানুষ— বিশ্বাসের পথটাই বেশি পছন্দ করে। কিন্তু তার ফলে যে কী ক্ষতি হয়, তা’ বোঝার জন্যেও মানসিক পরিশ্রম করতে সে নারাজ বা অপারক।
বিশ্বাসের পথে আত্মোপলব্ধি— সত্যোপলব্ধি, ঈশ্বরলাভ অথবা ঈশ্বরত্ব লাভ কিছুই সম্ভব হয় না। তবু, মানুষ বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধ’রে ছুটে–ছুটে মরে। তাই, মানুষকে সজাগ-সচেতন —যুক্তিবাদী —সত্যানুসন্ধিত্সু ক’রে তুলতে, মানুষের জীবনে একের পর এক দুর্ভাগ্য নেমে আসে। মানুষ যথেষ্ট সজাগ-সচেতন না হওয়াবধি বারবার আঘাত আসতে থাকে, এবং আসতেই থাকে।
বিশ্বাসের দ্বারা পৃথিবীতে যতটুকু ভালো হয়েছে, মন্দ হয়েছে তার চাইতে অনেক গুণ বেশি। সারা পৃথিবী জুড়ে যত অমানবিক কর্ম সংঘটিত হয়েছে, যত রক্তপাত হয়েছে ও হচ্ছে, তার অধিক অংশের মূলেই আছে বিশ্বাস। অন্ধ বিশ্বাস।
আর, যদি মনে কর, তোমার বিশ্বাসের পথই শ্রেষ্ঠ পথ, ওটাই শেষ কথা, তাহলে বুঝতে হবে, মহাধর্ম ও মহাবাদ তোমার জন্য নয়।
এই মহাবিশ্বরূপ ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা নিম্নচেতন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই, শঠতা ও প্রবঞ্চনাপূর্ণ প্রচলিত ধর্ম তাকে দিয়েছে সহজবোধ্য কাল্পনিক ঈশ্বর, যাতে সে তা-ই নিয়েই নির্বোধের স্বর্গে অলীক সুখে মশগুল হয়ে থাকে।
মানুষ যাতে ক্রমশ চেতনা-সমৃদ্ধ হয়ে— কোনো দিনই আসল ঈশ্বরকে জানার এবং উপলব্ধি করার ক্ষমতা অর্জন করতে না পারে, তারজন্য সমস্ত আয়োজনই পাকা করে রেখেছে এই ধর্ম নাম্নী অধর্ম।
একমাত্র প্রবল চেষ্টার দ্বারাই, ধর্মের এই কঠিন মায়াজালের ফাঁদ থেকে বেড়িয়ে এসে মুক্তি লাভ সম্ভব। চেষ্টা করো, নিশ্চয়ই পারবে। অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে যুক্তিপ্রিয় সত্যপ্রেমী হয়ে ওঠো। আমার শুভকামনা তোমার সঙ্গে থাকবে।
দীর্ঘকাল অন্ধকারে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে, যেমন আলোতে আসতে ভয় হয়, দীর্ঘ বন্দী-জীবন কাটানোর পর, মুক্ত জীবনে ফিরে আসতে যেমন ভয় হয়, তেমনই আজন্ম ধর্মের ঘেরাটোপে বন্দী থেকে অভ্যস্ত মানুষ--- ধর্মের মোহজাল ছিঁড়ে বেড়িয়ে এসে মুক্তজীবন লাভের কথা ভাবতেই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।
এই ভয়কে জয় কোরে মুক্তিলাভে সক্ষম হয় যে (যুক্তিপ্রিয় সত্যপ্রেমী মুক্তমনের) জন, সে-ই হলো প্রকৃত আলোকপ্রাপ্ত মানুষ।।